logo

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬ ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ১১:২৭ অপরাহ্ণ

বিশলক্ষ সবুজ স্বপ্নের অভিযাত্রী — ইঞ্জিনিয়ার টুটুল

একজন বৃক্ষপ্রেমিক মানুষের গল্প
প্রতিবেদন প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | সময়ঃ ১০:৩৩
  • সংবাদ পাঠকঃ ১৬৭২ জন
photo

জনতার পত্রিকা : 

 

কিছুমানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেন নিজের জন্য। আবার কিছু মানুষ জন্ম নেন পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে রেখে যাওয়ার জন্য। ইঞ্জিনিয়ার টুটুল সেই বিরল মানুষদের একজন, যার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন প্রকৌশলী ননতিনি একজনগাছপাগল মানুষ, একজন সবুজ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা।

আজথেকে প্রায় ৩২ বছর আগে, যখন পরিবেশ রক্ষা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সমাজে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না, যখন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ছিল না এতটা জনপ্রিয়, তখনই এক তরুণ প্রকৌশলীনিজের হৃদয়ে লালন করেছিলেন এক অসাধারণ স্বপ্নতিনি গাছ লাগাবেন, মানুষকে গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করবেন, আর সবুজে ভরেতুলবেন এই দেশ।

১৯৯৫সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর নিজের বেতনেরসামান্য কিছু টাকা বাঁচিয়ে তিনি কিনতেন বিভিন্ন জাতের ফলদ, বনজ ঔষধি গাছেরচারা। তারপর ছুটে যেতেন গ্রামের স্কুলে, শহরের বিদ্যালয়ে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতেন একটি করে সবুজ স্বপ্ন।

তিনিশুধু চারা দিতেন না; তিনি দিতেন ভবিষ্যতের আশা।

শিশুদেরসামনে দাঁড়িয়ে বলতেন

"গাছআমাদের অক্সিজেন দেয়। গাছ বৃষ্টি আনে। গাছ না থাকলে নদীশুকিয়ে যাবে, ফসল হবে না, পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হবে। গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয়। জীবনেরকঠিন সময়ে একটি বড় গাছও হতে পারে পরিবারের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাই আজ একটি গাছলাগাও, আগামী প্রজন্মকে একটি সুন্দর পৃথিবী উপহার দাও।"

শিশুরামুগ্ধ হয়ে শুনত। তারপর আনন্দভরে চারাগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরত। যত্ন করে রোপণ করত নিজের আঙিনায়। অনেক বছর পর সেই শিশুরাইবড় হয়ে ফল হাতে নিয়েআবার ফিরে আসত টুটুলের কাছে। বলত

"স্যার, এটা আপনার দেওয়া গাছের প্রথম ফল।"

এইএকটি মুহূর্তই যেন তাঁর সমস্ত ক্লান্তির পুরস্কার হয়ে উঠত।

কিন্তুএই পথ মোটেও সহজছিল না।

দিনভরসরকারি দায়িত্ব পালন করার পর, যখন সবাই বিশ্রাম নিত, তখন শুরু হতো তাঁর আরেকটি যুদ্ধ। রাতভর জেগে তিনি বেসরকারি বাড়ির নকশা ডিজাইনের কাজকরতেন। সেই কাজ থেকে যা উপার্জন হতো, তার প্রায় পুরোটাই ব্যয় করতেন গাছের চারা কেনার পেছনে।

অনেকসময় এমনও হয়েছেসংসারের বাজার করার টাকাও খরচ হয়ে গেছে চারাগাছ কিনতে।

নিজেরজন্য নতুন পোশাক কেনার আগে তিনি ভেবেছেন—"এই টাকায় আরওকতগুলো গাছ কেনা যায়?"

বিলাসিতাকখনো তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ তাঁর নেশা ছিল একটাইগাছ লাগানো।

বিশ্ববিদ্যালয়েপড়ার সময় থেকেই তিনি পরিবেশ বিষয়ক লেখা পড়তেন। জানতে পেরেছিলেন, পৃথিবীর বন ধ্বংস হচ্ছেদ্রুত। মানুষের লোভে কাটা পড়ছে লাখ লাখ গাছ। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বনভূমি। এমনকি পৃথিবীর "ফুসফুস" নামে পরিচিত আমাজন বনও রক্ষা পাচ্ছে না।

সেদিনইতিনি নিজের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন

"সবাইযদি গাছ কাটে, আমি অন্তত গাছ লাগাব। সবাই যদি নীরব থাকে, আমি অন্তত মানুষকে সচেতন করব।"

সেইপ্রতিজ্ঞাই আজ তাঁর জীবনেরসবচেয়ে বড় পরিচয়।

গত৩২ বছরে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকেঅন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন। লাখো শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দিয়েছেন সবুজের উপহার। নিজের হাতে রোপণ বিতরণ করেছেনপ্রায় ১১ থেকে ১২লক্ষ গাছের চারা।

তাঁরস্বপ্ন এখানেই শেষ নয়।

 

                                                                                                                                                    ইঞ্জিনিয়ার টুটুল

 

তিনিঘোষণা করেছেন

"আমিজীবিত অবস্থায় ২০ লক্ষ গাছেরচারা রোপণ বিতরণ করব, ইনশাআল্লাহ।"

আজতাঁর বয়স বেড়েছে। শরীর আগের মতো শক্তিশালী নয়। কিন্তু স্বপ্ন এখনও তরুণ।

আজতাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁর সন্তান সাকিব।

বাবা-ছেলে যখন বাড়ির নকশার কাজে দেশের বিভিন্ন জেলায় যান, তখন শুধু নকশা নিয়েই ফেরেন না। সঙ্গে থাকে কিছু চারাগাছ। কাছাকাছি কোনো স্কুল খুঁজে বের করেন। তারপর শিশুদের হাতে তুলে দেন ভবিষ্যতের সবুজ পৃথিবীর বীজ।

তাঁদেরকাছে প্রতিটি চারা শুধু একটি গাছ নয়; একটি স্বপ্ন, একটি দায়িত্ব, একটি আমানত।

আজদেশে সরকার, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনসকলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে। এই দৃশ্য দেখেইঞ্জিনিয়ার টুটুলের চোখে আনন্দের জল আসে। তিনিভাবেন

"আমিএকা শুরু করেছিলাম। আজ হাজার হাজারমানুষ এই পথে হাঁটছে।এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতেপারে?"

তিনিকখনো কোনো পুরস্কারের জন্য কাজ করেননি। কখনো সম্মাননা বা প্রচারের আশায়গাছ লাগাননি।

তিনিশুধু বিশ্বাস করেন

"মানুষএকদিন চলে যাবে, কিন্তু একটি গাছ শত বছর বেঁচেথেকে মানুষের উপকার করবে। তাই পৃথিবীর জন্য রেখে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপহার একটি গাছ।"

ইঞ্জিনিয়ারটুটুল আজও স্বপ্ন দেখেনএকদিন বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে। প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি গাছ রোপণ করবে। সেই দিন এই দেশ আরওসবুজ হবে, আরও সুন্দর হবে।

তিনিসকলের কাছে শুধু একটি দোয়াই চান

"মহানআল্লাহ যেন আমাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই কাজ করেযাওয়ার তাওফিক দেন। আমি চাই, আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একটি করে গাছ লাগিয়ে যেতে, একটি করে শিশুর হাতে সবুজ স্বপ্ন তুলে দিতে। কারণ আমি বিশ্বাস করিএকটি গাছ লাগানো মানে শুধু একটি চারা রোপণ নয়; একটি সুন্দর, নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবীরভিত্তি স্থাপন করা।"

হয়তোএকদিন মানুষ তাঁর নাম ভুলে যাবে।

কিন্তুতিনি যে লাখো গাছপৃথিবীর বুকে রেখে যাচ্ছেন, সেগুলো বাতাসে দুলে দুলে আগামী প্রজন্মকে বলে যাবে

"একজনমানুষ ছিলেন, যিনি নিজের সুখের চেয়ে পৃথিবীর সবুজকে বেশি ভালোবেসেছিলেন।"

শেয়ার করুন