পরিচয় পাল্টেছেন, দেশ বদলেছেন, ছদ্মনামে কাটিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু বদলাতে পারেননি জন্মগত একটি চিহ্ন, নাকের নিচে থাকা একটি তিল। এটিই শেষ পর্যন্ত ভেঙে দেয় ৪৫ বছরের পলাতক জীবনের সব নিরাপত্তা।
‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’
জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সেনাপ্রধান ও বাংলাদেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। তিনি ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। এই হত্যাযজ্ঞে সরাসরি অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর মোজাফফর হোসেন ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও মামলাসংক্রান্ত বিবরণ অনুযায়ী, মোজাফফর হোসেনই প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শনাক্ত করেন এবং তাকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর তিনিই চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে টেলিফোন করে জানান, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড’।
দুই সূত্রে মাসের পর মাস নজরদারি
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, এই আসামির বিষয়ে তাদের হাতে শুরুতে ছিল মাত্র দুটি তথ্য। প্রথমটি, মোজাফফরের মেয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দ্বিতীয়টি, মোজাফফরের নাকের নিচে রয়েছে একটি বড় কালো তিল।
এই দুটি সূত্রকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় অনুসন্ধান। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল, যাতায়াত ও সম্ভাব্য আবাসস্থল পর্যবেক্ষণ করেন গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসাকে সন্দেহের তালিকায় নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নীরব নজরদারি। ছদ্মবেশে এলাকার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, বাসাটিতে কারা যাতায়াত করেন, কী ধরনের জীবনযাপন- সবকিছু খতিয়ে দেখা হয়। কিন্তু চূড়ান্ত নিশ্চিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন গোয়েন্দারা।
যেভাবে সাজানো হয় অভিযান-
বুধবার গভীর রাতে অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। ডিবির একটি দল সাধারণ অতিথির ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে সামনে আসেন এক বৃদ্ধ। গোয়েন্দারা তার মেয়ের অফিস থেকে আসা কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানতে চান, মেয়ে বাসায় আছেন কি না।
বৃদ্ধ ব্যক্তি পাল্টা জানতে চান, এত রাতে কী কাজ? সেই মুহূর্তেই গোয়েন্দাদের চোখ যায় তার মুখের দিকে। অল্প আলোতেও স্পষ্ট দেখা যায় নাকের নিচের সেই পরিচিত কালো তিল।