অনলাইন ডেক্স :
‘পথ হারিয়ে’ দিশাহীন ট্রাম্প ‘কী করি আজ বুঝে না পাই’ দশায় উপনীত হয়েছেন। হুমকিধমকি ও ৩৯ দিনের সামরিক আগ্রাসনে তিনি নাজেহাল ইরানকে ‘নতি স্বীকার’ করতে বাধ্য করাতে ব্যর্থ হয়েছেন। মিত্র পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি সংলাপে বসেও নিজেদের শর্তে তেহরানকে বাধ্যানুগত বানাতে পারেননি। শেষে, তারই হুকুমে মার্কিন বাহিনী গতকাল সোমবার থেকে হরমুজ প্রণালির দুপাশসহ সর্বাত্মক নৌ অবরোধ শুরু করেছে। কিন্তু এই একতরফা আস্ফালন আর সর্বাত্মক অবরোধের সামনেও নিজেদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিন্দুমাত্র আপস করতে রাজি হয়নি ইরান। প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখেও তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেÑ ওয়াশিংটনের কোনো অন্যায় আবদার তেহরান মেনে নেবে না। উল্টো তাদের কড়া হুশিয়ারি, চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো হঠকারী পদক্ষেপ নিলে তার চরম খেসারত চুকাতে হবে। খবর দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি ও আল-জাজিরার।
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে টানা ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের ঘোষণা দেন। সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা থেকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এই অবরোধ কার্যকর করেছে। ট্রাম্পের এই দিশাহীন পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলোÑ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের বিপরীতে ইরান যে টোল আদায় করছে, তা বন্ধ করে দেশটির অর্থনীতি পঙ্গু করে দেওয়া। তবে ট্রাম্পের ‘অন্যান্য দেশও এই অবরোধে অংশ নেবে’, এমন দাবির সঙ্গে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া এই নৌ অবরোধে অংশ নেবে না বলে এরই মধ্যে জানিয়ে দিয়েছে।
মার্কিন নৌ অবরোধের খবরের পরপরই ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) কড়া বার্তা দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে কোনো সামরিক জলযান প্রবেশের চেষ্টা করলে ‘কঠোর ও চূড়ান্ত’ জবাব দেওয়া হবে। গত মার্চ মাস থেকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ইরান সেখানে মাইন ও ড্রোন মোতায়েন করে পশ্চিমা জাহাজগুলোকে রুখে দিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের
গালিবাফ ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি ম্যাপ পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের উদ্দেশে লিখেছেনÑ ‘এই তথাকথিত অবরোধের পর খুব শিগগির আপনাকে প্রতি গ্যালন তেলের জন্য ৪-৫ ডলার গুনতে হবে।’
ইসলামাবাদের ওই শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে সরাসরি ইসরায়েলকে দায়ী করেছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, আলোচনা যখন চলছিল, ঠিক সেই স্পর্শকাতর মুহূর্তে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ফোন করেন। আর ওই একটি ফোনেই শান্তি চুক্তির সব সম্ভাবনা ভেস্তে যায়।
এক্সে দেওয়া এক বার্তায় আরাগচি লেখেনÑ ‘নেতানিয়াহুর ওই ফোনকল পুরো আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষার দিকে নিয়ে যায়। যুদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র যা অর্জন করতে পারেনি, তারা সেটাই আলোচনার টেবিলে আদায় করতে চেয়েছিল।’
ওয়াশিংটন শুধু হরমুজ প্রণালিতে অবাধ যাতায়াতই চায়নি, বরং তারা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করতে ও মজুদ করা সব ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করার অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দিয়েছিল। ভ্যান্স এটিকে ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব’ বললেও তেহরানের কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
এত উত্তেজনার পরও মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা আশা ছাড়ছেন না। বিশ্লেষক এইচ এ হেলিয়ার সিএনএনকে বলেন, ‘দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি এখনও বহাল রয়েছে। কেউ যুদ্ধে ফিরতে চায় না, তাই আগামী দিনগুলোতে আরও কয়েক দফা আলোচনা হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি আরও সতর্ক করেনÑ ট্রাম্পের এই অবরোধ উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে, কারণ ইরান এরই মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা হারার আগে শেষ বিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবে।
এদিকে, এই কূটনৈতিক ব্যর্থতায় ওয়াশিংটনের মিত্রদের মধ্যেও বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। স্পেন ও ইতালি প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। ন্যাটোর অন্য সদস্য এবং উপসাগরীয় মিত্ররাও এ যুদ্ধে জড়াতে নারাজ। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন অনেকটাই একঘরে হয়ে এই চাপ সামলাচ্ছে।
অন্যদিকে, হরমুজ সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবার লাফিয়ে বাড়ছে। যুদ্ধবিরতির আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১৯ ডলারে পৌঁছালেও, সাময়িক শান্তির আশায় তা ৯৫ ডলারে নেমেছিল। কিন্তু এখন বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তেলের দাম আবারও ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীরাও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা জোরদার করার হুমকি দেওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ এক চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিক ও একতরফা সামরিক আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ভেবেছিল সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানকে পায়ের তলায় পিষতে পারবে। কিন্তু তেহরান পশ্চিমাদের পদতলে লুটিয়ে পড়েনি। নতুন সর্বোচ্চ নেতা, খামেনিপুত্র আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে উল্টো শিরদাঁড়া সোজা রেখে অপ্রতিরোধ্য প্রত্যাঘাত করে শত্রুশিবিরকে ঘায়েল করেছে। এই যুদ্ধে ইরান, লেবানন, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোয় অন্তত চার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।