শামসুল আলম স্বপন, কুষ্টিয়া :
১৯৭৯ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কুষ্টিয়াকে তাঁর নিজ জেলা ঘোষণা করেছিলেন । সেই থেকে কুষ্টিয়ার সংসদীয় চারটি আসনই ছিল বিএনপির ঘাঁটি। কিন্তু ২০০৮ সালে নির্বাচনে আসন গুলো দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবকটি আসন পুনরুদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন বিএনপি’র মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় বিএনপির সাথে ভোট যুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। এর মধ্যে কুষ্টিয়া-১ আসনে বিএনপিকে বেগ পেতে হচ্ছে দলের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীকে নিয়ে। ফলে শেষ সময়ে ভোটার টানতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী।
কুষ্টিয়া-১ আসন : দৌলতপুর :
ভারত সীমান্ত ঘেষা দৌলতপুর উপজেলা নিয়ে কুষ্টিয়া-১ আসন । এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪,০৪,৫০৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২,০৩,৪৯২ জন .নারী ভোটার ২,০১০১১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ১ জন।
এ আসনটি এক সময় ছিল বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। ভোট কারচুপির কারণে আওয়ামী লীগের আমলে আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায় বিএনপি’র । এ আসনটি এবার পুনরুদ্ধারে দলের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক ভাবে কাজ করছে। এ আসনটিতে এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা (বিএনপি), দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাওলানা বেলাল উদ্দিন (জামায়াতে ইসলামী), মোটরসাইকেল প্রতীকে নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা (স্বতন্ত্র), লাঙ্গল প্রতীকে শাহরিয়ার জামিল (জাতীয় পার্টি), হাতপাখা প্রতীকে আমিনুল ইসলাম (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), ট্রাক প্রতীকে শাহাবুল ইসলাম (গণঅধিকার পরিষদ), মোমবাতি প্রতীকে বদিরুজ্জামান (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট) এবং তারা প্রতীকে গিয়াস উদ্দিন (জেএসডি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিএনপির নেতা-কর্মী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির দলীয় প্রার্থী, স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাঠে থাকায় ভোট ভাগাভাগির আশঙ্কা রয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ আসনে ১৯৯১ সাল থেকে চারটি সংসদ নির্বাচনে টানা জয় পান বিএনপির প্রার্থী আহসানুল হক পঁচা মোল্লা। তিনি প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৪ সালের উপনির্বাচনে তাঁর ছেলে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে ধানের শীষের সেই ঘাঁটি দখলে নেয় আওয়ামী লীগ। সকল প্রার্থীই কমবেশী গণসংযোগ করছেন তবে এবার এ আসনটি ধানের শীষের প্রার্থীর জয় হবে বলে বিএনপি নেতা এ্যাডভোকেট রমজান আলী ও ভোটাদের অভিমত ।
কুষ্টিয়া-২ : (ভেড়ামারা ও মিরপুর ) :
ভেড়ামারা ও মিরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-২ আসন। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৮ হাজার একজন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৯ হাজার ১২৬ জন পুরুষ, ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন নারী ও ৩ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
আসনটিতে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর গ্রহণ যোগ্যতা তুলনামূলক ভাবে বেশী। পাশাপাশি ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর সঙ্গে দলের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী তিনবারের সাবেক এমপি অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে দলীয় সমঝোতা হওয়ায় বিএনপি সাংগঠনিক ভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে এই আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হলেও ১৯৮৬ সালে জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ারও ইতিহাস রয়েছে। ফলে জামায়াত এখানে অনেকটা শক্ত। কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল গফুর দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সাংগঠনিক ভাবে সক্রিয় থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে তার প্রভাব রয়েছে। ফলে এই আসনে ভোটের লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও বিএনপি অনেকটা এগিয়ে।
এছাড়া আসনটিতে ইসলামী আন্দোলন থেকে মোহাম্মদ আলী, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ থেকে মো. বাবুল আক্তার, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নূর উদ্দীন আহমেদ নির্বাচন করছেন। তবে সার্বিক বিচারে এখানে বিএনপি প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী এগিয়ে রয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে জামায়াতের আব্দুল গফুর। তবে আওয়মীলীগের ভোট টানতে সমর্থ হলে জামায়াতের জয় লাভেরও সম্ভবনা রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত জিতে যেতে পারে ধানের শীষ এমনটি বলছে ওই এলাকার জনগন।
কুষ্টিয়া-৩ : সদর আসন :
কুষ্টিয়া-৪ : কুমারখালী ও খোকসা :
জেলার কুমারখালী ও খোকসা উপজেলা নিয়ে গঠিত কুষ্টিয়া-৪ আসনটি। এই আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ২৪ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ১৩ হাজার ৫০৪ জন পুরুষ, ২ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন নারী ও ৫জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন।
এই আসনে ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর দীর্ঘ রয়েছে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পরিচিতি। তার পিতা সৈয়দ মাছউদ রুমী ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ জন এবং অত্যন্ত ভালো মানুষ। কুমারখালী খোকসায় রয়েছে তার ব্যাপক সুখ্যাতি।
এদিকে সকল বিরোধীতা ছেড়ে বিএনপি’র সকল নেতা-কর্মী এখন ঔক্যবদ্ধ। যে কারণে আসনটিতে বিএনপি অনেক এগিয়ে রয়েছে। জামায়াত প্রার্থী আফজাল হোসেনের দলীয় ভিত্তি থাকলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী ধনকুবের আনোয়ার খান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, জোট ভাঙনের কারণে এই আসনে ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে আসনটিতে সার্বিক বিচারে সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী রয়েছেন অনেক এগিয়ে। এছাড়া আসনটিতে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে তরুণ কুমার ঘোষ, গণফোরামের মো. আব্দুল হাকিম মিঞা ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি থেকে মো. শহিদুল ইসলাম নির্বাচন করছেন। এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের প্রার্থী আফজাল হোসেনের । এমনটি ধারণা করছে সাধারণ মানুষ । তবে শেষ পর্যন্ত জয় লাভ করবে ধানের শীষ এমনটি বলছে এ আসনের ভোটারা ।
কুষ্টিয়ার ৪ টি আসনেই নির্বাচনী লড়াই মূলত বিএনপি ও জামায়াত কেন্দ্রিক হবে। তবে আওয়ামীলীগের ভোটারদের সমর্থন ভোটার উপস্থিতি, কেন্দ্রভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে, এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ।