অফিস ডেস্ক
ঢাকা অফিস :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এর আগেই মোতায়েন হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে ৩৮টি নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভোটকেন্দ্র, ভোটার এবং ভোট গ্রহণের আগে পরে নিরাপত্তায় কোন বাহিনীর কী দায়িত্ব ও কর্তব্য হবে এ ব্যাপারে লিখিত নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ নির্বাচন সংক্রান্ত একটি বিশেষ টিম গঠন করতে বলেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈধ অস্ত্র বহন এবং প্রদর্শনের বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র বলেছে, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিজিবি ও র্যাবকে প্রয়োজনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। বিমান বাহিনীর হেলিপ্টার সহায়তাও নেবে নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভোটগ্রহণের দিন ও তার আগে-পরে পার্বত্য জেলা ও দুর্গম অঞ্চলে গমনের জন্য হেলিকপ্টারের ব্যবহার হবে। উক্ত এলাকার ভোটকেন্দ্রসমূহের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গমনাগমন এবং নির্বাচনী দ্রব্যাদি পাঠাতে হেলিকপ্টার সার্ভিস প্রদানে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপকূলের ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় নৌ বাহিনী ও কোস্ট গার্ড এবং সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোর নিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বিজিবি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমাদের সময়কে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। পুলিশের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৭ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হবে। মেট্রোপলিটন এলাকার ভেতরে সাধারণ কেন্দ্রে ১৬ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৭ জন দায়িত্ব পালন করবেন। পার্বত্য ও দুর্গম এলাকায় সাধারণ কেন্দ্রে ১৭ জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে অস্ত্রসহ একজন আনসার সদস্য প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায় থাকবেন।
সশস্ত্র বাহিনী: রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োজন অনুসারে সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সশস্ত্র বাহিনী অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে; সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকার নোডাল পয়েন্ট ও অন্যান্য সুবিধাজনক স্থানে অবস্থান করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে টহল ও অন্যান্য আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রয়োজনে নিরাপত্তা সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নির্দিষ্ট কেন্দ্রে স্ট্যাটিকভাবে অথবা দ্বিতীয় পর্বে ভোটকেন্দ্রিক মোতায়েনের অংশ হিসেবে কয়েকটি কেন্দ্রকে গ্রুপ করে মোবাইল টহলের আওতায় মোতায়েন হবে; মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসমূহ প্রয়োজনবোধে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করবে; প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সশস্ত্র বাহিনীর টিমের সঙ্গে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত করা হবে এবং আইন, বিধি ও পদ্ধতিগতভাবে কার্যক্রম গৃহীত হবে; উপকূলবর্তী এলাকায় নৌ-বাহিনী প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে এবং সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপূর্ণ এলাকা অনুযায়ী কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করবে;
ঝুঁকি বিবেচনায় রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে আলোচনাক্রমে প্রতিটি জেলায় নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের সংখ্যা কমবেশি করা যাবে; পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা মহাসড়কসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; সড়ক ও মহাসড়কে একক অথবা যৌথভাবে নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে চেক পোস্ট অপারেশন পরিচালিত হবে; বিমান বাহিনী প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার ও পরিবহন বিমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও বাহিনীসমূহের অনুরোধে উড্ডয়ন সহায়তা প্রদান করবে; সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশনা অনুসারে এলাকাভিত্তিক মোতায়েন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে।
বাংলাদেশ পুলিশ : পুলিশ নির্বাচনী এলাকায় সামগ্রিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ও ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে শান্তিশৃঙ্খলা বিধান এবং ভোটারগণের জন্য আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে দায়িত্ব পালন করবে; নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সকল সরঞ্জাম ও দলিল দস্তাবেজ বহন করার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; নির্বাচন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; নির্বাচন কার্যালয়সমূহ, রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তা বিধান করবে; স্থানীয় জননিরাপত্তা, ভোটকেন্দ্রে ভোটারগণের সুশৃঙ্খল লাইন করানোসহ স্থানীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে; মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসমূহ প্রয়োজনবোধে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করবে; সংবেদনশীল কেন্দ্রসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের মধ্য হতে একজন সদস্য বডিঅর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন; এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ বাহিনী অপারেশন ও চেকপয়েন্ট অপারেশনে অংশ নেবে।
বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আর্মড পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়ন : বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আর্মড পুলিশ ও আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্যরা মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে; জেলা, উপজেলা ও থানাসমূহে বিজিবি এবং উপকূলীয় এলাকাসমূহে কোস্ট গার্ড দায়িত্ব পালন করবে; রিটার্নিং অফিসারের চাহিদা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করবে; বিজিবি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করতে পারবে; মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসমূহ প্রয়োজনবোধে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করবে; এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ বাহিনী অপারেশন ও চেকপয়েন্ট অপারেশনে অংশ নেবে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন : র্যাব মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে; নির্বাচনী এলাকায় সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবে; রিটার্নিং অফিসারের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহায়তা করবে; আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করতে পারবে; মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসমূহ প্রয়োজনবোধে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ বাহিনী অপারেশন ও চেকপয়েন্ট অপারেশনে অংশ নেবে।
আনসার ও ভিডিপি : রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্যান্য সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সাপেক্ষে দায়িত্ব পালন করবে; নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সকল সরঞ্জাম ও দলিল দস্তাবেজ বহন করার সময় নিরাপত্তা সহায়তা প্রদান করবে; ভোটকেন্দ্রে ভোটারগণের সুশৃঙ্খল লাইন করানোসহ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করবে এবং সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের আইনানুগ যে কোনো নির্দেশনা প্রতিপালন করবে; প্রতি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য একজন অস্ত্রসহ আনসার সদস্য মোতায়েন হবে; মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সসমূহ প্রয়োজনবোধে ভোটকেন্দ্রের প্রাঙ্গণে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার্থে দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ বাহিনী অপারেশন ও চেকপয়েন্ট অপারেশনে অংশ নেবে।
বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ : বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্সধারীগণ যাতে অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন না করেন সে বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হচ্ছে। তবে ‘রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও জাতীয় সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের অনুকূলে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫’ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে বৈধভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল ও গৃহীত জাতীয় সংসদ সদস্য প্রার্থীর সশস্ত্র রিটেইনারের ক্ষেত্রে বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা প্রযোজ্য হবে না।
এদিকে আগামী ১৬ জানুয়ারি চালু হচ্ছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ। এই অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারী আনসার সদস্যদের প্রতি ভোটকেন্দ্রের উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতি বিষয়ে ইনপুট দিয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যগণকে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করবেন। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মোবাইল/স্ট্রাইকিং ফোর্স তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে যে কোনো প্রাপ্ত তথ্য ৯৯৯-এ এলে সেখানে গঠন করা বিশেষ টিম দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা এলাকাভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলকে জানাবে।