ধর্মডেক্স :
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, লোহিত সাগরে লাগাতার হামলা এবং সামরিক উত্তেজনার পারদ যখন চরমে, তখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চৌদ্দ শতক আগের ইসলাম ধর্মের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বেশ কিছু ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী। শেষ জামানার ফিতনা, যুদ্ধ এবং মুসলিম বাহিনীর অবস্থান নিয়ে হাদিস গ্রন্থগুলোতে ইয়েমেন ও শামের যে বিশেষ গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে, বর্তমান যুদ্ধাবস্থার সাথে তার কতটুকু মিল রয়েছে—তা নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
ইসলামের ইতিহাসের প্রামাণ্য গ্রন্থ সহীহ বুখারি ও সহীহ মুসলিম সূত্রে জানা যায়, ইয়েমেনের জনগণের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ অনুরাগ ও ভালোবাসা ছিল। একদিন ইয়েমেন থেকে একদল লোক মদিনায় আগমন করলে নবীজি সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন,
"তোমাদের মাঝে ইয়েমেনের অধিবাসীরা এসেছে। ওদের মন অত্যন্ত নরম এবং অন্তর অত্যন্ত কোমল। আসল ইমান তো ইয়েমেনি, আর প্রকৃত হিকমত ও প্রজ্ঞাও ইয়েমেনি।"
শুধু তাই নয়, মদিনার প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে রাসুল (সা.) দু’হাত তুলে বিশেষ দোয়া করেছিলেন— "হে আল্লাহ, আমাদের শামে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ, আমাদের ইয়েমেনে বরকত দান করুন।"
সুনানে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমাদের বর্ণনায় সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হাওয়ালা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, অচিরেই মুসলিমরা বিভিন্ন বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে পড়বে। যার একটি থাকবে শামে, একটি ইয়েমেনে এবং অন্যটি ইরাকে।
এই ভবিষ্যদ্বাণী শোনার পর হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হাওয়ালা (রা.) আরজ করেছিলেন, "হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকি, তবে আপনি আমাকে কোন বাহিনীতে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন?"
জবাবে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, "তোমরা শামকে বেছে নিও। কারণ এটি আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় ভূখণ্ড। আর যদি শামে যেতে অপারগ হও, তবে তোমরা ইয়েমেনে চলে যেও এবং সেখানকার পানির উৎস থেকে পান করো।"
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (সা.) যখন শাম ও ইয়েমেনের জন্য বরকতের দোয়া করছিলেন, তখন উপস্থিত কিছু সাহাবি ‘নজদ’ (যা বর্তমানে সৌদি আরবের মধ্যবর্তী) অঞ্চলের জন্যও একই দোয়া করার অনুরোধ জানান। কিন্তু নবীজি তা এড়িয়ে বারবার শাম ও ইয়েমেনের জন্যই বরকত কামনা করেন। তৃতীয়বার একই অনুরোধ করা হলে নবীজি নজদ অঞ্চলের দিকে ইঙ্গিত করে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, সেখানে ভূমিকম্প ও ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি হবে এবং সেখান থেকেই শয়তানের শিং ও বিভ্রান্তিকর শক্তির উত্থান ঘটবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইয়েমেনের বর্তমান যোদ্ধাদের ভূমিকা এবং বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান অনেকেই শেষ জামানার এসব হাদিসের সাথে মেলানোর চেষ্টা করছেন। কেউ কেউ একে নিছক ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বৈরথ বললেও, ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা এটিকে শেষ জামানার বিভিন্ন পূর্বাভাসের সাথে মিলিয়ে গভীর তাৎপর্য খুঁজে ফিরছেন।
সংঘাতময় বর্তমান বিশ্বে নবীজির এই দিকনির্দেশনা ও ভবিষ্যদ্বাণীগুলো শেষ জামানার ফিতনা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা এখন ধর্ম গবেষক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।