logo

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬ ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ ০৬:২৬ পূর্বাহ্ন

গাঁজায় দম চড়িয়ে মনা ব্যোমকালি আর বলিস নারে

প্রতিবেদন প্রকাশ: ১৪ অক্টবার ২০২৬ | সময়ঃ ০৬:৫১
  • সংবাদ পাঠকঃ ৩৬৮৬ জন
photo

 



: শামসুল আলম স্বপন : 

 

২০২০ সাল পর্যন্ত লালনের মাজারে ঢোকার গেটের ডান পাশে পøাকার্ডে বেশ বড় করেই লেখা ছিল “গাঁজায় দম চড়িয়ে মনা ব্যোমকালি আর বলিস নারে”, বাউল সম্রাট লালন সাঁই এর  এই অমোঘ  বাণী। বেশ কয়েক বছর হল প্লাকার্ডটি নেই যথা স্থানে । স্থানীয়রা বলেন,গাজা বিক্রেতা ও সেবনকারীরাই পøাকার্ডটি সম্ভবত রাতের আধাঁরে সরিয়ে ফেলেছে। 


ফকির লালন গাঁজা সেবন করতেন  কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে কেউ বলতে পারেননি। তবে তাঁর এই বানীই প্রমাণ করে তিনি গাঁজা সেবন অপছন্দ করতেন। 
লালন ভক্ত ও অনুসারী  চুয়াডাঙ্গার হাসিবুল শাহ বলেন,আমরা এখানে আসি তপস্যা করার জন্য ।  তিনি বলেন তপস্যার চারপথ-- স্থূল, পর্বত, ছাতক ও সিদ্ধি। গুরুর নামে যখন গাঁজা খাওয়া হয়, তখন সেটা হয় সিদ্ধি আর এমনি এমনি খেলে তা হয় নেশা করা পাগলামি। 


তিনি আরো  বললেন, সিদ্ধি  হচ্ছে আত্মার খোরাক। যার আছে দেহের ভেতর আত্মারাজা,সে খায় গাঁজা।যে গুরুর তরিকত করে সিদ্ধি খায়, সিদ্ধি সেবা করে সে।গুরুর নামে খেলে এটা সিদ্ধি, নইলে গাঁজা। তিনি আরো বলেন ফকির লালন সাঁই তার গানে ও দর্শনে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ ভাবে নেশা জাতীয় দ্রব্য বা বাহ্যিক আসক্তির বিরোধিতা করেছেন এবং আত্মশুদ্ধি ও মানবপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  


লালনের আখড়া এলাকায় স্মরণোৎসবের এই সময়টায় এখন গাঁজার গন্ধ ছাড়া এতটুকু জায়গা পাওয়া দুস্কর। তবে এখানে গাঁজা বিক্রি হয় গোপনে কিন্তু সেবন করা হয় প্রকাশ্যে , ভক্তদের  ছোট ছোট আসরে বসে গাজা সেবন করতেও দেখা যায় ।  লালনের অনুসারীদের মধ্যে সাধুও বাউলদের  গাঁজার ব্যবহার  কম থাকলেও, চিশতিয়া তরিকতের  যে দল রয়েছে এরা সকলেই গাঁজার ভক্ত।


লালন মেলায় গাঁজা খাওয়া  সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে । বাউল সম্রাট লালন স্ইাঁ এর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি জানানোর চেয়ে গাজার টানেই বেশী মানুষের  আগমন ঘটে আখড়াবড়িতে । 
তবে সকলেই গাঁজা খায় না। লালন ভক্তদের একটি তরিকার লোকই গাঁজায় অভ্যস্ত। সাধকদের খুব কম জনকেই তামাক ব্যবহার করতে দেখা গেছে এমন সাধু সন্নাসী রয়েছেন যারা তামাকের গন্ধ ও সহ্য করতে পারেন না। এসব পছন্দ ও করেন না।


( পুলিশের অভিযানে লালন আখড়ায় ২ হাজারের বেশী বাঁশি নামের কলকি উদ্ধার )

 

লালন ভক্ত এক জাতীয় পাগলরা গাজা সেবনে অভ্যস্ত। পাগলদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এরা সকলেই লাল কাপড় ব্যবহার করেন।বড় দাড়ি, অনেকের জটা চুল, ময়লা শরীর, গলায় পাথর ঝোলানো, বড় মালা ইত্যাদি। হাতে থাকে লাঠি বা এমন কিছু, যেটা দৈবশক্তি প্রকাশ করে। তপস্যার সঙ্গে গাঁজার সম্পর্ক নিয়ে কথা হয়, নাটোরের সাদেক আলী চিশতিয়ার সাথে । তিনি  জানালেন, গাঁজা খাওয়ার জন্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কলকি। এগুলোকে বলা হয় বাঁশি। রয়েছে, কৃষ্ণবাঁশি, নাগিনীবাঁশি, শঙ্খবাঁশি, বিচ্চু বাঁশি, গণেশ বাঁশি, মেগনে টবাঁশি ও সাধারনবাঁশি।কারুকার্য, বানানোর নিপুণতার দিক দিয়ে বাঁশির দাম ১০০টাকা থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত হয় বলে জানালেন তিনি। তবে সব চেয়ে বেশি চলে কৃষ্ণ বাঁশিই। এটি হলো সব চেয়ে ভাল কলকি ।

 

পাবনার বাউল রতন শাহ বলেন, ধর্ম হলো সত্য, মিথ্যা হলো পাপ। মানুষের কিছিম দু’টো। হুঁশ আর বেঁহুশ। বেহুঁশরে বন্দেগিরিতে সাধন ভোজন, প্রার্থনা নাই, আরাধনা নাই। এসব বেহুঁশ খরচ করে ভোজন করুক না কেন, কোন মজুরি পাবে না। যার হুঁশ আছে তার সব আছে, ধর্ম আছে। যে সিদ্ধি সেবা করে সে হুঁশে আছে।আত্মাকে খুঁজে পেতে সুবিধা হয় সিদ্ধি সেবনে। বলেন, নিজের দেহের ভেতর রয়েছে ৬টি আত্মা। ভূত আত্মা, পেত্নী আত্মা, জীব আত্মা, পরমাত্মা, দেবাত্মা এবং আত্মা অমেশ্বর। নিজের আত্মা খুঁজে পেতে হবে। আরো রয়েছে ১০টি ইন্দ্র আর ৬টি রিপু। এগুলোর কোনটার কি খাসরত (ভাব) সেটিও জানতে হবে। জানতে হবে দৈব শক্তি, চিনতে হবে সত্য পথ।
ডা. নাসিমুল বারী বলেন, তামাকের চেয়ে গাঁজা অধিক বিপদজ্জনক কারণ গাঁজা সেবনের সময় সিগারেটের তুলনায় ফুসফুসে অন্তত তিন থেকে চারগুণ বেশি কার্বন-মনোঅ•াইড ও অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ জমা হয়। সিগারেটে যে পরিমাণ ক্ষতিকর পদার্থ থাকে তার চেয়ে চার পাঁচ থেকে দশ গুণ বেশি থাকে গাঁজায়। ফলে গাঁজা সেবীদের ফুসফুসে ও শ্বাসনালীতে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গাঁজা সেবনে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবার ফলে সেবনকারীর সংক্রামক রোগ বেশি হয় এবং ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।

                                  ( পুলিশের অভিযানে লালন আখড়ায় ২ হাজারের বেশী বাঁশি  নামের কলকি উদ্ধার )

 


কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন এবার লালনের অনুষ্ঠানে গাজা ও মাদক  বিক্রি করার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহন করলেও গাজা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
মানিক গঞ্জের আমানত শাহ বলেন, প্রশাসন গাজা বিক্রি ঠেকাতে মরিয়া । কিন্তু ভক্ত সেজে অনুষ্ঠানের সামনে বসা সকলেই গাজার ব্যবসায়ী। ওরা বসার মাদুরের নীচে গাজা ও মাদক দ্রব্য রেখে দালালদের মাধ্যমে বিক্রি করে। অথচ প্রশাসন ভুল জায়গায় অভিযান চালায় ।
 

শেয়ার করুন