রাজবাড়ী প্রতিনিধি :
ছেলেকে ডিবি পুলিশ মাদকসহ আটক করেছে। মামলা থেকে বাঁচাতে হলে দিতে হবে ৭০ হাজার টাকা।
ফোনের ওপাশ থেকে এমন কথা শুনে একজন বাবা আর কতটা চিন্তা করতে পারেন? রাজবাড়ীর ব্যবসায়ী মোন্নাফ শেখও তখন ছেলের কথা ভেবে আর দেরি করেননি। প্রতারকদের দেওয়া নম্বরে তিন দফায় পাঠিয়ে দেন ৫০ হাজার টাকা।
কিন্তু টাকা পাঠানোর পর যখন ওই নম্বরে ফোন করলেন, তখন ফোন বন্ধ। সন্দেহ হলো। দ্রুত বাড়িতে ফিরে যা দেখলেন, তাতেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
যে ছেলেকে ডিবি পুলিশ মাদকসহ আটক করেছে বলা হয়েছিল, সেই ছেলে হুসাইন শেখ তখন বাড়িতেই!
অর্থাৎ পুরো ঘটনাটিই ছিল সাজানো প্রতারণা।
ঘটনাটি রাজবাড়ী সদর উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের। ২২ বছর বয়সী হুসাইন ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থী। বুধবার সকালে কলেজে যাওয়ার পর তাঁর বাবা মোন্নাফ শেখের কাছে ফোন আসে। কলদাতারা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, হুসাইন ও তাঁর দুই বন্ধুকে মাদকসহ আটক করা হয়েছে। মামলা না দেওয়ার বিনিময়ে প্রথমে ৭০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের সেই কৌশলেই ফাঁদে পড়েন বাবা। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছেলেকে সুস্থ-স্বাভাবিক অবস্থায় দেখে বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারিত হয়েছেন। পরে থানায় অভিযোগ করেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও মুন্সিগঞ্জের পদ্মা থানা এলাকা থেকে চাঁন মিয়া (৫৪) ও হাফিজুল মাতুব্বরকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে রাজবাড়ী সদর থানা পুলিশ।
পুলিশের তথ্যমতে, তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২ লাখ ২২ হাজার ৫০ টাকা, ছয়টি অ্যান্ড্রয়েড ফোন, দুটি বাটন ফোন এবং বিভিন্ন অপারেটরের ১২টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসেছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতারকরা মানুষের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটাতেই আঘাত করছে। সন্তান বিপদে আছে, পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, মামলা হয়ে যাবে, জেলে পাঠানো হবে, এখনই টাকা না দিলে বড় বিপদ হবে, এমন ভয় তৈরি করে মানুষকে ভাবার সুযোগই দেওয়া হয় না।
তাই এমন ফোন এলে প্রথম কাজ টাকা পাঠানো নয়, তথ্য যাচাই করা।
সন্তান সত্যিই আটক হয়েছে কি না, কোন থানায় আছে, কোন মামলায় আটক, সংশ্লিষ্ট থানায় সরাসরি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হতে হবে। পরিচিত আত্মীয় বা পরিবারের অন্য সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রয়োজনে ৯৯৯ বা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে।
মনে রাখবেন, ফোনের ওপাশের মানুষের গলা যতই পুলিশের মতো শোনাক, ভয় দেখিয়ে টাকা চাইলেই তিনি পুলিশ হয়ে যান না।
একটি ফোনকল, কয়েক মিনিটের ভয় আর ভুল সিদ্ধান্ত একজনের সারা জীবনের সঞ্চয় কেড়ে নিতে পারে।
এই ঘটনায় অন্তত সেই বাবার ৫০ হাজার টাকা গেছে। কিন্তু সময়মতো অভিযোগ করায় প্রতারক চক্রের দুই সদস্য পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।