জনতার পত্রিকা :
দুর্নীতির অভিযোগে পদাবনতি হয়েছিল। চার বছর পদোন্নতিও স্থগিত ছিল। সেই প্রকৌশলীই এখন ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক।
প্রশ্নটা তাই শুধু একজন প্রকৌশলীকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহির সংস্কৃতি নিয়েও।
প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর। ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর একনেকে অনুমোদন পায়।
জুয়েলের অতীত নিয়েই বিতর্কের শুরু।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর ভবনে কম্পন অনুভূত হলে ২০১৬ সালে তদন্ত কমিটি করা হয়। তদন্তে ছাদের কংক্রিটের পুরুত্ব নকশায় নির্ধারিত সাড়ে ৫ ইঞ্চির পরিবর্তে কোথাও ৩ ইঞ্চি, কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি পাওয়ার কথা প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ওই ঘটনায় কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি দেওয়া এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখার তথ্য একাধিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যসূত্র যুগান্তর
তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যও আছে।
জুয়েল অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তিনি আরও বলেছেন, ছাদ ঢালাইয়ের সময় তিনি দেশে ছিলেন না এবং অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন সেই শাস্তি প্রত্যাহার করে এবং ২০২৫ সালে তাকে উপপ্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এরপর আসে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব নিয়ে বিতর্ক।
তিনি বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বদলি, পদায়ন ও তদবিরে হস্তক্ষেপের অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। অর্থাৎ অভিযোগ আছে, পাল্টা বক্তব্যও আছে। কিন্তু প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জনসমক্ষে কতটা হয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
এর মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৮ জুন তাকে খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রেষণে পাঠানো হয়।
এরপর শুরু হয় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পদ নিয়ে আলোচনা।
প্রথমে প্রকল্পটির রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। পরে ২৯ জুলাই খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। তখনও প্রকল্পের পিডি নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
শেষ পর্যন্ত ১ সেপ্টেম্বরের অফিস আদেশে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ডিএমডি আরিফুল ইসলাম জুয়েলকে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের নেতৃত্বে আসলে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
রাজনৈতিক পরিচয় নয়।
ব্যক্তিগত তদবির নয়।
কোনো দলের প্রতি আনুগত্যও নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত সততা, কারিগরি দক্ষতা, পূর্বের কর্মদক্ষতার রেকর্ড এবং সর্বোপরি জবাবদিহি।
কারও বিরুদ্ধে পুরোনো অভিযোগ থাকলে সেটি সত্য কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার। যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার হওয়া দরকার। আর যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়ে থাকে, সেটি কীভাবে বাতিল হলো, কোন প্রক্রিয়ায় শাস্তি প্রত্যাহার হলো, পরে পদোন্নতি এবং এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী কী যাচাই করা হয়েছে, সেই তথ্যও জনগণের জানার অধিকার আছে।
কারণ ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের টাকা এবং আন্তর্জাতিক ঋণ ও সরকারি অর্থের সমন্বয়ে পরিচালিত একটি বড় প্রকল্প।
আর খুলনার মানুষের জন্য পানি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। পানি তাদের মৌলিক প্রয়োজন।
তাই এই প্রকল্পে কে পিডি হলেন, সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রকল্পের প্রতিটি টাকা কোথায় যাচ্ছে, কোন প্রতিষ্ঠান কাজ পাচ্ছে, কী দামে কাজ হচ্ছে, কাজের মান কী এবং প্রকল্প শেষ হওয়ার পর মানুষ আসলে কী সুবিধা পাচ্ছে।
অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা হোক, মিথ্যা হলে অভিযোগকারীদের বক্তব্যেরও জবাবদিহি হোক।
কিন্তু ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পে একটি বিষয় যেন কোনোভাবেই না হয়, তা হলো রাজনৈতিক সরকার বদলাবে, কিন্তু তদবিরের সংস্কৃতি বদলাবে না।
এবার অন্তত প্রশ্নটা সেখানেই হওয়া উচিত।