মার্কিন শুল্ক কাঠামোয় বাংলাদেশ সুবিধা পেয়েছে


 

ঢাকা অফিস :  তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় দুই বাজারে এখন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বাংলাদেশের। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আগস্টে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে রেকর্ড গতিতে, বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বছরের প্রথম সাত মাসে পোশাক রপ্তানি কমেছে দ্বিগুণ অঙ্কে। মার্কিন বাজারে জুলাইয়ের সামান্য পতন কাটিয়ে আগস্টে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এলেও ইইউর বাজারে রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। শুধু বাজারের চাহিদা কমাই নয়, ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায় রপ্তানি আয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে দেশের প্রধান দুই পোশাক বাজারে এমন বিপরীতমুখী প্রবণতা তৈরি পোশাক খাতের সামনে নতুন করে বাজার বৈচিত্র্য, মূল্য প্রতিযোগিতা ও রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে।

 

চলতি বছরের আগস্টে বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তৈরি পোশাক। আগস্টে পোশাক রপ্তানি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে সামগ্রিক রপ্তানিতে স্বস্তি এলেও বড় বাজারগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান এবং ইউরোপীয় বাজারের দুর্বলতা একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে ইউরোপীয় বাজারে বড় পতনের তথ্য সামনে চলে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৬.৪৩ শতাংশ কমে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি ৮০৬ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জুলাইয়ের তুলনায় এটি ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ে রপ্তানি কিছুটা কমলেও আগস্টে বড় ধরনের উন্নতি হয়েছে।

 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাস মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ১ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১১ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি।

আগস্টের বৃদ্ধিই মূলত দুই মাসের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে ওপরে তুলেছে। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি প্রায় ০.১৮ শতাংশ কমেছিল, কিন্তু আগস্টে ২৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়ার পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে বলে রপ্তানি তথ্য ও শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্কহার কার্যকর হয় এবং পোশাকের ক্ষেত্রে মোট শুল্কের কাঠামো বদল হয়েছে। একই সময়ে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের ওপরও ভিন্ন হারে শুল্ক আরোপ করা হয়। ফলে মার্কিন ক্রেতাদের সোর্সিং স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রভাবিত হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক পরিস্থিতি কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করছে। তবে এটিকে স্থায়ী সুবিধা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ শুল্কের পাশাপাশি পণ্যের দাম, সরবরাহের সময়, মান, শ্রমমান, কাঁচামালের উৎস এবং ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি সোর্সিং পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাক আমদানির বাজারে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সামগ্রিকভাবে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাইয়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে এই পতনের চেয়েও বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ইইউতে কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

অর্থাৎ ইইউর বাজারে চাহিদা কমার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়লেও বাংলাদেশ শুধু বাজার সংকোচনের কারণে কমেনি; বরং সামগ্রিক বাজারের তুলনায় আরও বেশি হারে বাজার হারিয়েছে।

ইইউর আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৪ হাজার ৩৮৮ দশমিক ৮৩ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করে ইইউ। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি কমেছে প্রায় ২ হাজার ৭৭৫ মিলিয়ন ইউরো।

শুধু মূল্য নয়, আমদানির পরিমাণও কমেছে। গত বছরের প্রথম সাত মাসে ইইউ ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন কেজি পোশাক আমদানি করেছিল। এ বছর তা কমে হয়েছে ২ হাজার ৬০১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন কেজি—পতন ৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

ইইউর পোশাক বাজারে ক্রেতারা এ বছর আগের তুলনায় কম পোশাক কিনছেন। একই সঙ্গে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্যও কমেছে। সব উৎস মিলিয়ে গড় ইউনিট মূল্য ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৯ দশমিক ৮৪ ইউরো হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে কেজিপ্রতি ১৩ দশমিক ৮০ ইউরো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তুলনায় এটি ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন গড় মূল্য।

ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই সঙ্গে দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে— রপ্তানির পরিমাণ কমছে এবং প্রতি কেজি পোশাকের দামও কমছে। এর ফলে মোট রপ্তানি আয়ের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০২৫ সালের জুনে ১ হাজার ৩৫৫ দশমিক ৫৩ মিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১ হাজার ৩৬৭ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ইউরো হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি আরও কিছুটা বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি ছিল ১ হাজার ৬৬৭ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ইউরো। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৭২৯ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ইউরো— প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।

এই দুই মাসের প্রবৃদ্ধির কারণে জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির যে ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন ছিল, জানুয়ারি-জুলাই শেষে কিছুটা উন্নীত হয়ে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ক্রমপুঞ্জীভূত পতন ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।

তবে এই পরিবর্তনকে এখনই বাজার পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সাত মাসের হিসাবে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও দ্বিগুণ অঙ্কে কম। একই সময়ে ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানিও কমেছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য সাম্প্রতিক মাসগুলোর প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জানুয়ারি-জুলাইয়ের সামগ্রিক চিত্র এখন নেতিবাচক হলেও জুন ও জুলাইয়ে টানা প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে জানুয়ারি-জুনের ১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ পতন সাত মাসে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশে নেমেছে।


Email: bijoynews24bd@gmail.com

প্রকাশকঃ রোকমুনুর জামান রনি

সম্পাদকঃ শামসুল আলম স্বপন

ফোনঃ 01716954919 / 01722158130

যোগাযোগঃ A-231 Housing Estate, Kushtia-7000.

© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।