প্রতিবেদন প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, সময়ঃ ১১:১৮
কুমিল্লা প্রতিনিধি : ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে অবৈধ পথে দেশ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে জিম্মি হয়েছেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবক। তাদের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছে দালালচক্র।টাকা না পেয়ে যুবকদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানুষিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে অর্থ আদায়ের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভীষিকাময় এসব ভিডিও দেখে অসহায় পরিবারগুলো চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
ঘটনার প্রতিকার চেয়ে এবং জিম্মি যুবকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছে। একই সঙ্গে সরকারের জরুরি কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
জিম্মি হওয়া যুবকেরা হলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।
জিম্মি থাকা যুবক মো. সোহেলের ছোট বোন লিজা আক্তার জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে দালাল মানিকের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে তার ভাই ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হন। গত নয় মাসে ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে পুরো টাকাই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতালি তো দূরের কথা, তাকে লিবিয়ায় নিয়ে দালালচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে
তিনি জানান, গত ২৯ জুন সোহেল ফোন করে পরিবারের সদস্যদের জানান, তাদের অন্য একটি দালালচক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকে মুক্তিপণ হিসেবে ২৭ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।
সর্বশেষ ১৯ জুলাই সোহেল একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানান, তাদের আটকের বিষয়টি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর দালালদের নির্যাতন আরও বেড়ে গেছে। যেকোনো সময় তাদের হত্যা করা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ভুক্তভোগী মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান জানান, ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় নয় মাস আগে দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে তার ভাই সামছুল আলম ২০ লাখ টাকা নেন। পরে মানিকুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হলেও সেখানে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তাকে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে মুক্তিপণের দাবিতে ছেলের ওপর চলছে ভয়াবহ নির্যাতন।
একই অভিযোগ করেন লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের শাহ আলম। তিনি বলেন, প্রায় আট মাস আগে একই দালাল সামছুল আলমকে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ছেলে মেহেদী হাসানকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সেও দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। এখন ছেলেকে বাঁচাতে নতুন করে ২৫ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, লিবিয়ায় নেওয়ার পর প্রায় আট মাস যুবকদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্প্রতি আরও একটি নিষ্ঠুর দালালচক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে প্রত্যেকের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের প্রতিটি দৃশ্য ভিডিও করে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পাঠানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নির্যাতনের ভিডিও এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত দালাল সামছুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা গত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে, লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল দালাল মানিকের সঙ্গেও এখন আর কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিবারগুলো।
এ অবস্থায় জিম্মি যুবকদের স্বজনরা দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তাদের উদ্ধার এবং মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সন্তানদের জীবিত ফিরে পাওয়াই এখন তাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়া কিংবা মানবপাচারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।