প্রতিবেদন প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, সময়ঃ ১২:০৮
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্যের জেরে দুই দেশ আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। উভয় পক্ষের হামলায় সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বিরোধ নতুন করে এই সংঘাতের মূল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ও বৃহস্পতিবারের হামলার পর গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতির সমঝোতা স্মারককে ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করেন। অন্যদিকে তেহরান অভিযোগ করেছে, ওয়াশিংটন একতরফাভাবে এমন ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা ওই সমঝোতার পরিপন্থি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, দ্বিতীয় রাতের অভিযানে ইরানের ৯০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর আগের দিন আরও ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়। সেন্টকমের দাবি, উপকূলীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নজরদারি অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, নৌ সক্ষমতা এবং সামরিক রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে এসব হামলা চালানো হয়েছে, যাতে ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করা যায়।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের দুই দিনের হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে বুশেহর, বান্দার আব্বাস, চাবাহার, সিরিকসহ হরমুজ প্রণালির আশপাশের একাধিক শহরে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি রেলসেতু ও অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলা হয়েছে, যা তারা ‘জঘন্য যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি, উত্তর ইরানের গোলেস্তান প্রদেশে আক তাকেহ খান রেলসেতুতেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সেতু চীন, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবাণিজ্য করিডরের অংশ। চলতি বছরে উপসাগরীয় বন্দরগুলো অবরুদ্ধ হওয়ার পর এই রুটটির কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।
বুশেহর প্রদেশেও একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ইরানের আধা-সরকারি মেহর বার্তা সংস্থা জানায়, সামরিক ও বেসামরিক কয়েকটি স্থানের পাশাপাশি বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি এবং আসালুয়েহর একটি মৎস্যবন্দরের আশপাশেও হামলা হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তা এহসান জাহানিয়ান বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। পরে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কোনো ক্ষতি হয়নি।
এর জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কাতারে একটি স্যাটেলাইট অ্যান্টেনা এবং বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরান আরও দাবি করেছে, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোও তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল।
কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সর্বশেষ হামলায় অন্তত একজন আহত হয়েছেন। দেশটির দাবি, চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির আশপাশে প্রায় ছয় হাজার নাবিক আটকা পড়ে আছেন। সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ বলেন, এই সংঘাত নিরীহ নাবিকদের জীবনকে আবারও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, সর্বশেষ সংঘাতের মূল কারণ গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের ভিন্ন ব্যাখ্যা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।
তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালিত হতে হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের অনুমতির প্রয়োজন নেই। ইরানের কর্মকর্তারা মনে করেন, বিষয়টি শুধু নৌ চলাচলের স্বাধীনতার নয়; ভবিষ্যতের যেকোনো সংঘাতে হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ধরে রাখাও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ওমান উপকূল ঘেঁষে এমন একটি বিকল্প সামুদ্রিক করিডর গড়ে তুলছে, যা ইরানের নিয়ন্ত্রণকে কার্যত অকার্যকর করে দেবে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পরিচালনার অভিযোগ তুলেছে ইরান। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত তেলবাহী জাহাজ ওই বিকল্প করিডর ব্যবহার করে উপসাগর ত্যাগ করায় নতুন সংঘাত হলেও বৈশ্বিক তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধাক্কার আশঙ্কা কমেছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, যুদ্ধবিরতি থেকে ইরান প্রত্যাশিত সুবিধা পায়নি বলে দেশটির কট্টরপন্থি অংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছিল। বিকল্প নৌপথ চালু থাকায় হরমুজ প্রণালিকে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি তেহরান। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি সরকারগুলো এখনও ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সমঝোতা অনুযায়ী পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করায় ইরানের জব্দকৃত সম্পদও মুক্ত হয়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
একই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হওয়া কাঠামোগত সমঝোতার কারণে যুদ্ধবিরতি স্মারকের লেবানন-সংক্রান্ত ধারাগুলোর প্রয়োজনীয়তাও কমে গেছে, যা ইরানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে এই সংঘাত আরও কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে হোয়াইট হাউস আশঙ্কা করছে। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, শুরুতে লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচির অবশিষ্ট অংশ দুর্বল করা; কিন্তু এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি নৌপথ।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার রাতে নতুন করে হামলার অনুমোদন দেওয়ার পেছনে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না হওয়া এবং দ্বিতীয়ত, ন্যাটো সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলা।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে বিদেশি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় হামলার ঘটনা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে বলেও তিনি মনে করেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, আলোচনায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল, পরে আবার দাবি করে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করিনিÑ এ কথা কে বিশ্বাস করবে?’
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রে মতপার্থক্য আরও তীব্র হয়েছে। অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, সামরিক প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রাখা নাকি কূটনৈতিক পথেই এগোনো হবেÑ এ নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে বিভক্তি রয়েছে। এক পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চাইলেও কট্টরপন্থিরা নতুন কোনো সমঝোতার বিরোধিতা করছে। উভয় পক্ষই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য একে অন্যকে দায়ী করছে।
তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও হামলা চালালে ইরান কঠোর জবাব দেবে। এর আগে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল-থানি টেলিফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে কথা বলে উভয় পক্ষকে কূটনৈতিক পথে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং হরমুজ প্রণালিতে কাতারের একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার নিন্দা জানান।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের ‘ভিত্তিহীন অভিযোগের’ প্রতিবাদ জানিয়ে তেহরানে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হুগো শর্টারকে তলব করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। লন্ডনের অভিযোগ, ইরান যুক্তরাজ্যে গোপন তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করেছে। তেহরান অভিযোগটি অস্বীকার করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সহযোগিতার সমালোচনা করেছে।
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।