প্রতিবেদন প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, সময়ঃ ১২:১০
শামসুল আলম স্বপন :
মেজর নিহা হত্যার রায় ৫ বছরেও কার্যকর হয়নি : এটা কি বাংলাদেশে বিচারহীনতার এক জগন্য নজির নয়কি ?
মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায়ে আট আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে আদালত বলেছে, দেড় বছর আগে সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তাকে পুলিশ চেকপোস্টে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি ছিল ‘পরিকল্পিত’।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল সোমবার জনাকীর্ণ আদালতে এই আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ভ্রমণ বিষয়ক তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে কক্সবাজারে অবস্থান করছিলেন তিনি ।
এ মামলার প্রধান দুই আসামি টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে রায়ে।
এছাড়া তিন পুলিশ সদস্য এবং পুলিশের তিন সোর্সকে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বাকি চার পুলিশ সদস্য এবং তিন এপিবিএন সদস্য বেকসুর খালাস পেয়েছেন।
দণ্ডিত আসামিদের কোন অভিযোগে কেন সাজা দেয়া হয়েছে, রায়ে তা তুলে ধরেছেন বিচারক।
২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের শামলাপুর চেকপোস্টে গুলি করে হত্যা করা হয় সিনহা মো. রাশেদ খানকে।
তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর, যিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেয়ার পর কয়েকজন তরুণকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ বিষয়ক তথ্যচিত্র বানানোর জন্য কক্সবাজারে গিয়েছিলেন।
ওই ঘটনায় সিনহার বোন মামলা করার পর ১২ পুলিশসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন র্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম। একজন আইনের লোক হয়েও ওসি প্রদীপ কীভাবে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বন্দুকযুদ্ধ সাজিয়ে খুন করে যাচ্ছিলেন টাকার জন্য, তা উঠে আসে তার তদন্তে।
তথ্যচিত্র নির্মাণে কক্সবাজারে গিয়ে সিনহা ও তার সঙ্গীরা টেকনাফের নিরীহ মানুষের উপর ওসি প্রদীপের ‘অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনী’ জেনে গিয়েছিলেন। এরপর বিপদ আঁচ করতে পেরে প্রদীপের পরিকল্পনায় সিনহাকে হত্যা করা হয়। প্রদীপের নির্দেশে সিনহাকে গুলি করেন লিয়াকত। বাকিরা তাদের সহযোগিতা করেন।

২০২১ সালের ২৭ জুন ওই ১৫ আসামির বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন বিচারক ইসমাইল। সাত মাস পর সোমবার তিনি রায় ঘোষণা করলেন।
রায়ের আগে ১৫ আসামিকে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পুলিশ প্রহরায় কক্সবাজার জেলা আদালতে নিয়ে আসা হয়। বেলা ২টায় আদালত কক্ষে হাজির করা হয় তাদের। বেলা ২টা ২৪ মিনিটের দিকে বিচারক রায় ঘোষণা শুরু করেন।
এরপর বেলা ৪টা ২০ মিনিটের দিকে সাজা ঘোষণা করেন বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল।
বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলক ও পূর্ব পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় লিয়াকত ও ওসি প্রদীপ আগাগোড়া নেতৃত্ব দান করায় ৩০২,২০১,১০৯, ১১৪, ১২০ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের দুজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হল।”
লিয়াকতের সাজার কারণ ব্যাখ্যা করে বিচারক বলেন, “সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাথে ষড়যন্ত্র করে উপর্যপুরি গুলি করে আসামি লিয়াকত আলী। মৃত্যু নিশ্চিত করতে বিলম্বে হাসাপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ও হত্যার আলামত ধ্বংস করতে মেজর সিনহা ও তার সঙ্গী সিফাতের বিরুদ্ধে দুটি মিথ্যা মামলা করে সে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছে।”

আর প্রদীপের সাজার কারণ জানিয়ে বিচারক বলেন, “সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যার উদ্দেশ্যে আসামি প্রদীপ কুমার দাশ অপর আসামিদের সাথে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করে পূর্ব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অপর আসামিদের সহায়তায় সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে হত্যা করে, বুকে লাথি মেরে পাঁজরের দুটি হাড় ভেঙে, গলা চেপে মৃত্যু নিশ্চিত করে, হাসপাতালে পাঠাতে দেরি করিয়ে, হত্যার দায় থেকে বাঁচার জন্য এবং ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মামলার আলামত ধ্বংস করে, দুটি মিথ্যা মামলা করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।”
যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া তিন পুলিশ সদস্য নন্দ দুলাল রক্ষিত, সাগর দেব ও রুবেল শর্মা তাদের ঊর্ধ্বতনের আদেশ ‘অসৎ উদ্দেশ্যে অপরাধ সংঘটনের জন্য’ জেনেও অন্য আসামিদের সহায়তায় করে, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হত্যার দায় থেকে বাঁচার জন্য আলামত ধ্বংস করে এবং সিনহা ও তার সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করার অপরাধে দণ্ডিত হয়েছে বলে জানান বিচারক।
এছাড়া মারিশবুনিয়া এলাকার তিন বাসিন্দা আয়াজ উদ্দিন, নুরুল আমীন ও নিজাম উদ্দিন নিজেদের এলাকায় মাইকিং করে ‘ডাকাত’ আখ্যায়িত করে গণপিটুনিতে সিনহা ও তার সঙ্গীকে হত্যার চেষ্টা করায়, ব্যর্থ হয়ে তাদের গতিবিধির বিষয়ে টেলিফোনে হত্যাকারীদের জানিয়ে দিয়ে ‘অপরাধ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করায় এবং মাদকের মিথ্যা মামলায় সাক্ষী হয়ে অপরাধ করায় তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারক।
তিনি বলেন, অন্য সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দেয়া হল।

কার কী সাজা !
প্রদীপ কুমার দাশ, (মৃত্যুদণ্ড) কক্সবাজারের টেকনাফ থানার ওসি
সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, প্ররোচনা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং পরে ঘটনা ধামা-চাপা দেওয়ার চেষ্টা
লিয়াকত আলী, (মৃত্যুদণ্ড) টেকনাফ থানার বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক
হত্যার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, সিনহা মো. রাশেদ খানকে সরাসরি গুলি করে হত্যা, ওসি প্রদীপের এসব পরিকল্পনায় সক্রিয় সহযোগিতা, হত্যার ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়ে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার চেষ্টা
নন্দ দুলাল রক্ষিত, (যাবজ্জীবন) বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই
সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা, ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রভাবিত করার জন্য সিনহার গাড়ি থেকে ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মিথ্যা মামলা দায়ের
রুবেল শর্মা, (যাবজ্জীবন) টেকনাফ থানার কন্সটেবল
ওসি প্রদীপের সঙ্গে ঘটনস্থলে গিয়ে হত্যার ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা, সিনহার গাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারের গল্প বানানো, সিনহার সঙ্গীকে নির্যাতন
সাগর দেব, (যাবজ্জীবন) টেকনাফ থানার এএসআই
ওসি প্রদীপের সঙ্গে ঘটনস্থলে গিয়ে হত্যার ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা, সিনহার গাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারের গল্প বানানো, সিনহার সঙ্গীকে নির্যাতন
মো. নুরুল আমিন, (যাবজ্জীবন) পুলিশের সোর্স
হত্যার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে জড়িত থাকা, সিনহাকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা, সিনহার সহযোগীদের তথ্য সংগ্রহ, প্রদীপকে সহযোগিতা

মোহাম্মদ আইয়াজ, (যাবজ্জীবন) পুলিশের সোর্স
হত্যার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে জড়িত থাকা, সিনহাকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা, সিনহার সহযোগীদের তথ্য সংগ্রহ, প্রদীপকে সহযোগিতা
মো. নিজাম উদ্দিন, (যাবজ্জীবন) পুলিশের সোর্স
হত্যার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নে জড়িত থাকা, সিনহাকে ডাকাত আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা, সিনহার সহযোগীদের তথ্য সংগ্রহ, প্রদীপকে সহযোগিতা
লিটন মিয়া, (যাবজ্জীবন) বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের এএসআই
সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে সহায়তা করা, আহত সিনহার প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো, অস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনদের হুমকি, সিনহার সঙ্গীর ওপর নির্যাতন
ছাফানুল করিম, (খালাস) বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের কনস্টেবল
সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে সহায়তা করা, আহত সিনহার প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো, অস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনদের হুমকি, সিনহার সঙ্গীর ওপর নির্যাতন
কামাল হোসাইন আজাদ, (খালাস) বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের কনস্টেবল
সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে সহায়তা করা, আহত সিনহার প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো, অস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনদের হুমকি, সিনহার সঙ্গীর ওপর নির্যাতন
আবদুল্লাহ আল মামুন (খালাস) বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের কনস্টেবল
সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনা ভিন্নখাতে প্রভাবিত করতে সহায়তা করা, আহত সিনহার প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখানো, অস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনদের হুমকি, সিনহার সঙ্গীর ওপর নির্যাতন

শাহজাহান আলী (খালাস) এপিবিএন এর এসআই
শামলাপুর চেকপোস্টে সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা, সিনহাকে লিয়াকত গুলি করার পর তাকে ঘিরে রাখা
আবদুল্লাহ আল মাহমুদ (খালাস) এপিবিএন কনস্টেবল
শামলাপুর চেকপোস্টে সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা, সিনহাকে লিয়াকত গুলি করার পর তাকে ঘিরে রাখা
মো. রাজিব হোসেন (খালাস) এপিবিএন কনস্টেবল
শামলাপুর চেকপোস্টে সিনহাকে হত্যায় সহযোগিতা, সিনহাকে লিয়াকত গুলি করার পর তাকে ঘিরে রাখা
রায় ঘোষণার পর কান্না-ক্ষোভ
ফাঁসির রায় ঘোষণার পর লিয়াকত আলী ও প্রদীপ কুমার দাশকে নীরবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তাদের কিছুটা বিমর্ষ দেখাচ্ছিল।
বিচারক যাবজ্জীবন সাজার ছয় আসামির নাম ঘোষণার পর তাদের কয়েকজন চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন।
আবার বেকসুর খালাস পাওয়াদের নাম ঘোষণার পর তাদের আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আয়াজ উদ্দিন কাঠগড়ায় থাকা অবস্থায় বলতে থাকেন, “আমরা সুবিচার পাইনি। আমরা সাধারণ মানুষ। ঘটনাস্থলের আশেপাশেও যাইনি। আমাদের কাছে কিছু পায়নি। তবু আমাদের যাবজ্জীবন দিয়েছে। এটা ঠিক না। আমি এদেশের নাগরিক।”
রায়ের পর আসামিদের আবার প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হয়।
সে সময় আদালত প্রাঙ্গণে আসামির স্বজনদের চিৎকার করে কাঁদতে দেখা যায়।
একজন মিলিটারি অফিসারকে গলায় পাড়া দিয়ে মেরে ফেলা, সেই কসাই প্রদীপের রায়কার্যকর আর কতোদেরি? হাজারের উপর মানুষের, জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়া সেই কসাই প্রদীপের জীবনের প্রদীপ এখনো জ্বলে কিভাবে? এটা-কি বিচারহীনতার বাংলাদেশের জন্য একটি উপযুক্ত প্রমান নয় কি? ১ হাজরের উপর মানুষের জীবন নি-স্তেজ করে দিয়ে সে হয়তো তার জেল নামক স্বর্গে মুরগির রোস্ট উপভোগ করছে।
মানুষ কি দেখবে না সেই বিচার! যেখানে একজন মিলিটারি অফিসার হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হয় না,সেখানে সাধারণ মানুষের বিচারের আশা ছেড়ে দেওয়ায় উচিৎ!
© Jonotar Potrika ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সতর্কতাঃ অনুমতি ব্যতীত কোন সংবাদ বা ছবি প্রকাশ বা ব্যবহার করা যাবে না।