কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে উচ্চারণ করেন, “ওপরওয়ালা কুষ্টিয়ায় কেউ নেই, ওপরওয়ালা এখন আমি।” উক্ত বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হইয়াছে এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়াছে। একটি সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার পর তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে ইহা বলেন বলিয়া সংবাদে উল্লেখ আছে।
বক্তব্যটি উচ্চারণমাত্রই জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটে। রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্বাচিত প্রতিনিধি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার অধিকারী। কিন্তু তিনি কি “উপরওয়ালা” বলিয়া নিজেকে অভিহিত করিতে পারেন। সংবিধান ও আইনের শাসনের অধীনে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিই জবাবদিহির আওতাভুক্ত। জেলার উপর ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ধারণা গণতান্ত্রিক মানসিকতার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে।
ইহার পূর্বে উক্ত সংসদ সদস্য আরেক প্রসঙ্গে দাবি করেন যে, মেডিক্যাল কলেজ সংক্রান্ত বিষয়ে তিন দিনের মধ্যে তাঁহাকে ৫০ কোটি টাকার ঘুষ প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু তিনি তাহা গ্রহণ করেন নাই। যদি উক্ত দাবি সত্য হয়, তবে ইহা একটি গুরুতর অপরাধের ইঙ্গিত বহন করে। রাষ্ট্রীয় আইন ও নৈতিক বিধান অনুসারে ঘুষ প্রস্তাবকারী ও গ্রহণকারী উভয়ই দণ্ডনীয়। অতএব প্রশ্ন উপস্থিত হয় উক্ত প্রস্তাবদাতার বিরুদ্ধে কি আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে। অভিযোগ দায়ের, তদন্তের আবেদন বা প্রকাশ্য নামোল্লেখ। ইহাদের কোনটি সম্পন্ন হইয়াছে কি না, তাহা জনসমক্ষে স্পষ্ট নহে।
এ প্রসঙ্গে সিনিয়র সাংবাদিক শামসুল আলম স্বপন তির্যক সমালোচনা করিয়া বলেন, উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা প্রদান সহজ, কিন্তু প্রমাণ ও পদক্ষেপ ব্যতীত উক্তি কেবল জনমোহিনী বাক্য বলিয়াই বিবেচিত হইবে। তিনি আরও স্মরণ করাইয়া দেন যে, পূর্বে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য প্রসঙ্গে অতিরঞ্জিত দাবির অভিযোগ উঠিয়াছিল, যাহা গ্রামবাসীর বক্তব্যে সমর্থন পায় নাই বলিয়া দাবি করা হয়। উক্ত বিষয়গুলির সত্যতা পৃথক তদন্তসাপেক্ষ; তথাপি জনমনে সংশয় সৃষ্টির কারণ ইহাই যে, বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান পরিলক্ষিত হইলে আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।
রাজনীতিতে দৃঢ়তা কাম্য, কিন্তু দৃঢ়তার ভাষা অহংকারে পরিণত হইলে তাহা জনমানসে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। “উপরওয়ালা” শব্দটি ধর্মীয় ও নৈতিক অভিঘাত বহন করে; রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইহার ব্যবহার সংযম দাবি করে। কারণ একটি জেলার উপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব ব্যক্তির নহে। আইন, সংবিধান ও জনগণের।
অতএব বর্তমান বিতর্কের মূল প্রশ্ন ব্যক্তিগত উক্তি নহে বরং জবাবদিহি। যদি ঘুষ প্রস্তাবের ঘটনা সত্য হয়, তবে তাহার স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। যদি প্রশাসনিক সংস্কারের অঙ্গীকার থাকে, তবে তাহার ফল দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধির মর্যাদা উচ্চারণে নহে, কার্য্যে প্রতিফলিত হয়।
কুষ্টিয়ার উপর “উপরওয়ালা” কেহ নন। কুষ্টিয়ার উপর আছে রাষ্ট্রের আইন ও জনগণের রায়। গণতন্ত্রে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তি নহে, জনগণই।
প্রতিবেদক : আলী কদর পলাশ, সম্পাদক : দৈনিক এই আমার দেশ, ঢাকা ।